ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিরাট অগ্রগতি
১৬ ফেব্রুয়ারি: পারমাণবিক কর্মসূচিতে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর আপত্তিতে থাকা ইরানের পরমাণু কর্মসূচির এ বিরাট অগ্রগতির ঘোষণা গতকাল সদর্পে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। এ সময় তিনি বলেন, ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রচেষ্টায় আরও ৩ হাজার সেন্ট্রিফিউজ যুক্ত করেছে।
এর আগে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানানো হয়, নতুন ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ সেন্ট্রিফিউজ ও নিজস্ব পরমাণু রিঅ্যাক্টর ফুয়েল প্লেট তৈরিতে ইরান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। দেশে তৈরি পারমাণবিক জ্বালানিসমৃদ্ধ রড বা দণ্ড এই প্রথমবারের মতো পরমাণু চুলি্লতে স্থাপন করেছে দেশটি। ইরানের এ ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাবে। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বলে আসছে, পরমাণু কর্মসূচির আড়ালে আণবিক বোমা তৈরি করছে ইরান। যদিও ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলে আসছে, তার পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। নতুন প্রজন্মের দ্রুতগতির অধিক কার্যকর ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ সেন্ট্রিফিউজ তৈরির ঘোষণায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইরানের এ অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশটি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হবে না। ইরানের এই নতুন পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দেশটিকে আরও একঘরে করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আর ইরানের এই পারমাণবিক অগ্রগতির ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করে রাশিয়া বলেছে, পরমাণু অস্ত্রধারী ইরান রাশিয়ার মোটেই কাম্য নয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হয়, প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদের নেতৃত্বে গতকাল দিনের শেষে তেহরানের নাতাঞ্জ রিসার্চ রিঅ্যাক্টরে প্রথমবারের মতো দেশে তৈরি ২০ শতাংশ পরমাণুসমৃদ্ধ ফুয়েল বা জ্বালানি ভরা হচ্ছে। টেলিভিশনে এ ঘটনাকে ইরানের কারিগরি অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিরাট মাইলফলক বলে অভিহিত করা হয়। এতে আরও দেখানো হয়, জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান পরমাণু জ্বালানি চক্রের সব বিষয়ই আয়ত্ত করেছে।
টেলিভিশনে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান ফেরেইদুন আবাসি দাবানিসহ অন্য কর্মকর্তারা (সবার পরনে সাদা কোট) রিঅ্যাক্টরের ভেতর একটি ধাতব আবৃত রড পর্যবেক্ষণ করছেন। এ সময় ওই রড স্থাপনাটির তরল পদার্থে ঢোকানো হচ্ছিল। এরপর টেলিভিশনে চার ইরানি বিজ্ঞানীর ছবি দেখানো হয়। তাদের তিনজন পরমাণু গবেষক, যাদের গত দু'বছরে আততায়ীরা হত্যা করেছে। এরপর মিডিয়ার উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আহমাদিনেজাদ বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তবু যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। এ প্রোপাগান্ডা বন্ধ করতে তিনি তাদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইরানের অগ্রগতি চায় না বলেই তাদের এ প্রোপাগান্ডা। সূত্র : এএফপি, বিবিসি।
এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান আলি বাঘেরি ইরান স্টুডেন্ট নিউজ এজেন্সিকে (আইএসএনএ) জানান, 'তেহরান পারমাণবিক গবেষণা চুলি্ল'তে প্রথমবারের মতো দেশে তৈরি পারমাণবিক ফুয়েল রড (জ্বালানি) সংযুক্ত করা হবে। প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ এ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। একই দিন রাশিয়ার বার্তা সংস্থা আরআইএকে বাঘেরি জানান, পশ্চিমা দেশগুলো আমাদের সহযোগিতা না করায় ফুয়েল রড তৈরি করার লক্ষ্যে আমরা ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করি।
তেহরান গবেষণা চুলি্লটি চিকিৎসা ও কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য তেজস্ক্রিয় রেডিও আইসোটোপ তৈরি করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বের দাবি, ইরান পরমাণু বোমা তৈরির উদ্দেশে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত জানুয়ারিতে ইরান ঘোষণা দেয়, তারা দেশে সফলভাবে ফুয়েল রড তৈরি ও পরীক্ষা করেছে। ওই সময় ইরান জানায়, দীর্ঘ মেয়াদে গবেষণাগার চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে তারা নিজেরাই তা উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগ, ইরান যে কোনো সময় তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিশেষ চুলি্লর জ্বালানিতে রূপান্তর করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ দেশটি পরমাণু বোমা তৈরি শুরু করতে পারে।
গতকাল ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয়, ইরান পরমাণু খাতে বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। চতুর্থ প্রজন্মের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করেছে দেশটি। এটি কার্বন ফাইবার দিয়ে তৈরি। এ সেন্ট্রিফিউজগুলো অনেক দ্রুত কাজ করে, অপচয় কম হয় এবং জায়গাও কম দরকার হয়। ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ফুয়েল রড তৈরির কথাও জানানো হয় টেলিভিশনে।
অন্যদিকে এক প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড বলেন, পরমাণু খাতে এ অগ্রগতি সত্ত্বেও ইরান সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে না। ওয়াশিংটনে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি একথা বলেন।