হোমপেজ রাজনীতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা তৈরি করছে বিএনপি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা তৈরি করছে বিএনপি

১৬ ফেব্রুয়ারি: নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ 'অন্তর্বর্তীকালীন' সরকারের রূপরেখা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া এ সংক্রান্ত খসড়া প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়েছেন দলের কয়েকজন সংবিধান বিশেষজ্ঞকে। নির্দলীয় 'অন্তর্বর্তীকালীন' কিংবা 'অস্থায়ী' সরকারের রূপরেখা সংসদে এসে উত্থাপন করা হলে তা নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত_ এ মর্মে সরকারি দল থেকে বক্তব্য আসার প্রেক্ষাপটে এ খসড়া তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সংসদে এসে 'অন্তর্বর্তীকালীন' সরকারের রূপরেখা তুলে ধরার ব্যাপারে বিরোধী দলের একাধিক নেতার সঙ্গে সরকারি দলের একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রীর 'অনানুষ্ঠানিক' যোগাযোগ হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এনে সরকার ও বিরোধী দল একধরনের সমঝোতায় আসতে উদ্যোগী হতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। কৌশলগত কারণে আপাতত নাম প্রকাশ না করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নতুন 'ফর্মুলা' তৈরির সঙ্গে জড়িত বিএনপি নীতিনির্ধারক নেতারা এ তথ্য জানিয়েছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আগামী নির্বাচন 'তত্ত্বাবধায়ক' বা যে কোনো নামে 'অন্তর্বর্তীকালীন' সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সবার আগে সরকারি দলের সদিচ্ছা প্রয়োজন। সরকার 'ইতিবাচক' মনোভাব পোষণ করলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আমরা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি নতুন কোনো ফর্মুলা দেবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে সরকার সমঝোতামূলক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এলে বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতা হলে বিএনপি সংসদে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিল উত্থাপন করবে। অন্যথায় সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তা বাতিল করে দেবে। কাজেই আগে সমঝোতা প্রয়োজন।

খসড়া 'ফর্মুলা'য় যা থাকতে পারে : নতুন 'ফর্মুলা'

তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির একজন নেতা জানান, বিএনপির সম্ভাব্য ফর্মুলায় রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করে আওয়ামী লীগ থেকে ৫ জন ও বিএনপি থেকে ৫ জন নিয়ে ১০ জন উপদেষ্টার সমন্বয়ে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব থাকবে না। বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাবের চিন্তাভাবনা করছেন তারা। একই সঙ্গে প্রস্তাবনায় আরও কিছু নতুন 'বিকল্প' সংযোজন হতে পারে।

সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসনের পরামর্শে সংবিধান বিশেষজ্ঞ বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যের নেতৃত্বে দলের আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ নেতা খসড়া প্রস্তাবনার কাজ শুরু করেছেন। অত্যন্ত গোপনে কাজ শুরু করেছেন তারা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা কূটনীতিক, দাতা সংস্থা এবং দেশের সুশীল সমাজের সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

সূত্র জানায়, বিএনপির নতুন প্রস্তাবনায় সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ৫ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের বিষয়টি যুক্ত করতে বলা হবে। সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নির্দলীয় একটি সরকার গঠন করতে হবে। এর আগে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধানটি সংবিধান থেকে বাদ দিতে হবে।

'রূপরেখা' তৈরির কাজের সঙ্গে যুক্ত এক নেতা জানান, রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করে দু'দল থেকে ৫ জন করে ১০ জন উপদেষ্টার সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব না করার পেছনে তাদের বেশ কিছু যুক্তি রয়েছে। ১৯৯৫ সালে স্যার নিনিয়ান সমঝোতা করতে আসার পর রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান উপদেষ্টা করে দু'দল থেকে ৫ জন করে ১০ জন উপদেষ্টা করার বিষয়ে প্রস্তাব করেছিল বিএনপি। তখন আওয়ামী লীগ তা প্রত্যাখ্যান করেছিল।

একই সঙ্গে ওই নেতা এও বলেন, আসলে দলীয় রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর অধীনে দু'দল থেকে উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়ে 'তত্ত্বাবধায়ক' বা 'অন্তর্বর্তীকালীন' যে নামে সরকার গঠন করা হোক_ তা হবে কার্যত 'ডাবল দলীয়' সরকার। দলীয় সমর্থনে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি প্রধান উপদেষ্টা হলেও নিরপেক্ষ হতে পারবেন না। নিজের দলের প্রতি তার দুর্বলতা থেকে যাওয়াই স্বাভাবিক।

'সময় ও সুযোগ' বুঝে উত্থাপন : বিএনপি গোপনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নতুন 'ফর্মুলা'র খসড়া তৈরি করলেও কবে এটি পেশ করা হবে_ তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বিএনপির খসড়ার সঙ্গে জড়িত নেতারা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থার জন্য সরকারি দল বিল আনতে অসুবিধা বোধ করলে তারা বিল আনতে পারেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে সরকারের কোনো অ্যালার্জি থাকলে অন্য যে কোনো নামে 'তত্ত্বাবধায়ক' বা নির্দলীয় নিরপেক্ষ 'অন্তর্বর্তীকালীন' সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি করেন। ইতিপূর্বে তিনি শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছিলেন।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, তারা কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবেন না। বেগম জিয়া বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে সরকারের কোনো 'অনীহা' থাকলে এই 'শব্দ' ব্যবহার না করে 'অন্তর্বর্তী' বা 'অস্থায়ী' বা অন্য যে কোনো নামে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যাপারে আগে বর্তমান সরকারকে ফর্মুলা দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হবে, সংবিধান সংশোধন করে আগামী নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে সম্পন্ন হবে। কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি তারা বাতিল করেছেন। তারা কীভাবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে চান_ তা তাদের আগে উত্থাপন করতে হবে।

পর্দার আড়ালে : সূত্র জানিয়েছে, প্রকাশ্যে সরকার ও বিরোধী দল রাজপথে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিলেও পর্দার আড়ালে 'অনানুষ্ঠানিকভাবে' দেশি-বিদেশিদের চাপের মুখে নমনীয় হচ্ছে কিছুটা। এ পরিস্থিতিতে সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করে 'সমঝোতার' পথে হাঁটার ব্যাপারে উভয় দলের মধ্যেই ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিষয়ে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে বিরোধী দলের নেতাদেরও কথাবার্তা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা এবং দেশের সুশীল সমাজও রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে উভয় দলকে সমঝোতায় পেঁৗছতে চাপ দিচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে সরকার ও বিরোধী দলকে সহনীয় মনোভাব পোষণ করে সমঝোতায় পেঁৗছার আহ্বান জানিয়ে আসছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা।

সূত্র জানায়, অনানুষ্ঠানিকভাবে সরকারি দলের নেতা ও বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা 'আশ্বস্ত' হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নতুন ফর্মুলা তৈরির কাজে হাত দিয়েছে বিএনপি। তবে রাজনৈতিক সমঝোতায় পেঁৗছতে সুন্দর পরিবেশের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীদের বক্তব্য-বিবৃতিতে আরও সংযত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা।

বিএনপির নীতিনির্ধারক এক নেতা বলেন, গতবারও (১৯৯৫ সাল) দেখেছি, পশ্চিমা দেশগুলো_ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো, একদলীয় নির্বাচন সমর্থন করেনি। তারা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চেয়েছে। এবারও একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য 'ইতিবাচক' অবস্থান নিয়েছে তারা। একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয় বলে অভিমত দিয়েছে পশ্চিমারা। এবার মার্কিন রাষ্ট্রদূত মুখে রাজনৈতিক সমঝোতার কথা বলছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিকে কোনো প্রস্তাব দেননি। সরকারকে সমঝোতার প্রস্তাব দিতে হবে। দিয়েছেন কি-না জানি না।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, আমরা এখন সরকারি দলের ইতিবাচক মনোভাবের অপেক্ষায় রয়েছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামী ১২ মার্চের ঢাকায় মহাসমাবেশের পর সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হবে। এদিকে আগামী ১২ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে 'চলো চলো ঢাকা চলো' স্লোগানের মাধ্যমে মহাসমাবেশ করবে দলটি। একই দিন পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে ঘিরে বেড়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনা।

By A Web Design