হোমপেজ জাতীয় খুনিরা গ্রেফতার না হলে রুনির পরিবারের আত্মাহুতি

খুনিরা গ্রেফতার না হলে রুনির পরিবারের আত্মাহুতি

 
 


১৯ ফেব্রুয়ারি: 'খুনিদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নইলে আত্মাহুতি'_ এমনটাই ভাবছে সাংবাদিক মেহেরুন রুনির পরিবার। ঘটনার ৮ দিন পরও খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় সাগর-রুনি পরিবারের সদস্যদের মাঝে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। রুনির ভাই নওশের আলম রোমান গতকাল বলেন, 'খুনিদের গ্রেফতার করতে হবে। আমরা ন্যায়বিচার চাই। খুনিদের গ্রেফতার করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত না করা হলে বিকল্প কিছু বিষয়ের কথা ভাবছি। ন্যায়বিচার না পেলে যে কোনো সময় পরিবারের সবাই আত্মাহুতি দিতে প্রস্তুত। আমরা মানবাধিকার কমিশনে যাওয়ার কথাও চিন্তা করছি।'

এদিকে সাগরের বৃদ্ধ মা সালেহা মুনীর বলেন, 'ন্যায়বিচারের দায় প্রধানমন্ত্রীর কাছেই রাখলাম।' সাগরের বোনজামাই অধ্যাপক আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, 'খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় আমরা হতাশ হয়ে পড়েছি।' প্রয়োজনে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ও এফবিআইর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের এনে রহস্য বের করার দাবি জানান তিনি।

গতকালও এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কোনো অগ্রগতি জানাতে পারেনি পুলিশ। একটি সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত ৯টায় পশ্চিম রাজাবাজার থেকে পুলিশ সন্দেহভাজন দু'জনকে আটক করে জিজ্ঞাসা করেছে। তাদের নাম জানাতে অস্বীকৃতি জানান তদন্ত কর্মকর্তারা।
এদিকে সাংবাদিক দম্পতির হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি বরাবর আবেদন করেছেন মামলার বাদী রুনির ভাই রোমান। রোমান জানান, ঘটনার পর শেরেবাংলা নগর থানায় করা মামলায় কিছু বিষয় বাদ পড়েছে। বাদপড়া কয়েকটি বিষয় মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করেছি। এগুলো হলো_ বাসা থেকে ১১শ' ইউরো, কিছু বাংলাদেশি মুদ্রা (অঙ্ক বলা হয়নি) খোয়া যাওয়া, ১০-১১ ভরি স্বর্ণালঙ্কার না পাওয়ার বিষয়টি। এ ছাড়া তদন্ত কর্মকর্তারা গতকাল রুনিদের পরিবারের কাছে কিছু মালপত্র ফেরত দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সাগরের ল্যাপটপ, অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড, মানিব্যাগ ইত্যাদি।


সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আলামত দেখে বলা হয়েছিল, খুনিরা 'অপেশাদার'। একই রকম বক্তব্য ছিল লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের। এখন প্রশ্ন উঠেছে_ 'অপেশাদার' খুনি ধরতেই কেন হাবুডুবু খাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী? পেশাদার তদন্ত কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে কেন দীর্ঘ সময় পরও কথিত 'অপেশাদার' খুনিদের গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হচ্ছেন? তদন্ত নিয়ে পুলিশের রহস্যজনক আচরণে জনমনে নানা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। অনেকের জিজ্ঞাসা, খুনিকে শনাক্ত করার পর কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপে পুলিশ মামলাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে কি-না। কারও কারও আশঙ্কা_ সাংবাদিক দম্পতি হত্যার প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না। 'সাগরের গভীর পানিতেই' নিমজ্জিত থাকবে সাগর-রুনি হত্যা মামলার নেপথ্য রহস্য।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল আবারও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদারকি করছেন, নির্দেশনা দিচ্ছেন। এ মামলা ধামাচাপা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দোষীদের আড়াল করতে প্রভাবশালী কারও চাপ আছে কি-না_ এমন প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে প্রভাবশালী আর কে আছেন?'

হত্যাকাণ্ডের ৮ দিন পার হলেও কোনো খুনিকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এমনকি কাউকে শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি বলে জানানো হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য, সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করে তদন্ত কাজ চলছে। এরপরও পুলিশের পক্ষ থেকে মামলার অগ্রগতি নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো তথ্য না পাওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উল্টো এ ঘটনা নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আগ বাড়িয়ে নানা বক্তব্যের কারণে জনমনে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। থানা থেকে মামলাটি ডিবিতে আসার পরও তদন্তে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এদিকে গতকালও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ খুনিদের শিগগিরই গ্রেফতার, সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। আগামী শনিবারের মধ্যে জড়িতরা গ্রেফতার না হলে নেতৃবৃন্দ চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া চাঞ্চল্যকর এ হত্যার বিচার দাবিতে গতকালও বিভিন্ন সংগঠন নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে।

যেখানে মিলছে না 'চোর-ডাকাত' তত্ত্বের হিসাব : মামলা তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, কয়েকটি কারণ সামনে নিয়ে আমরা মামলাটির তদন্তে নেমেছি। এর মধ্যে একটি হলো, ফ্ল্যাটের পেছনের জানালা দিয়ে কোনো দুর্বৃত্ত চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্যে সাংবাদিক দম্পতির বাসায় প্রবেশ করেছিল কি-না। আমরা পাতলা গড়নের এক ব্যক্তি দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছি, জানালার কাটা অংশ ব্যবহার করে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করা সম্ভব। ওই কর্মকর্তাই জানান, চোর-ডাকাত ঘরে প্রবেশ করলেও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে মিলছে না। তাহলো, হত্যার পর মালামাল নিয়ে ওই জানালা দিয়ে দুর্বৃত্তরা বের হলে কোথাও রক্তের দাগ বা অন্যান্য আলামত থাকত। এ ছাড়া সাংবাদিক দম্পতির বাসা থেকে খোয়া যাওয়া মালপত্র দেখেও সন্দেহ রয়েছে_ প্রকৃত অর্থেই চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল কি-না। মোবাইল, ল্যাপটপসহ বাসার গুরুত্বপূর্ণ মালপত্র অক্ষতই রয়ে গেছে। এমনকি সাংবাদিক দম্পতির সাড়ে পাঁচ বছরের ছেলে মেঘ ঘটনার পর জানিয়েছিল, তার মা-বাবাকে হত্যাকারী দুই ব্যক্তিকে এর আগে সে পিকনিকে দেখেছিল। দুই ব্যক্তি বাসা থেকে যাওয়ার পর ফ্ল্যাটের মূল দরজা মেঘ বন্ধ করে। এ বক্তব্য সঠিক হলে সাংবাদিক দম্পতির ফ্ল্যাটে চোর-ডাকাত তত্ত্বের হিসাব মিলছে না।

মামলা ডিবিতে গেলেও তদন্তে অগ্রগতি নেই : সাংবাদিক দম্পতি হত্যার ৩৬ ঘণ্টা পর রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি থানা থেকে ডিবিতে এলেও তদন্ত নিয়ে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি নেই। হত্যাকাণ্ড বিষয়ে ডিবির পক্ষ থেকে গত কয়েক দিন থেকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করা হতো। গতকাল থেকে সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে গোয়েন্দা সদস্যরা কথা বলতে চাচ্ছেন না।

তদন্ত নিয়ে নানামুখী বক্তব্য : সাংবাদিক দম্পতি হত্যার ঘটনার দু'দিন পর ১৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদর দফতরের নিয়মিত ক্রাইম কনফারেন্সে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছিলেন, 'তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। খুব শিগগিরই এর রহস্য উন্মোচন করা হবে।' একদিন পর মঙ্গলবার কোস্টগার্ডের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেছিলেন, 'খুব শিগগিরই আপনারা এ ব্যাপারে ইতিবাচক সংবাদ শুনবেন।' পরদিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের বক্তব্যে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেছেন, গোয়েন্দা পুলিশ হত্যার পেছনে একাধিক কারণের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ৬টি কারণ সামনে রেখে তদন্তকাজ চলছে।

এখনও হত্যার মোটিভ খুঁজছে পুলিশ : সাগর-রুনি হত্যার মোটিভ নিয়ে পুলিশ এখনও ঘোর অন্ধকারে। পারিবারিক বা টাকা-পয়সা নিয়ে বিরোধের কোনো তথ্য গতকাল পর্যন্ত মেলেনি। এ অবস্থায় পুলিশ সাগরের লেখা ৫টি বই, ২০০৭ সাল পর্যন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট, মাছরাঙা টেলিভিশনের বেশ কয়েকটি টক শো এবং পার্বত্য অঞ্চলের এক নেতার সাক্ষাৎকার (সাগরের নেওয়া) সংগ্রহ করেছে। এসব রিপোর্ট, টক শো এবং সাক্ষাৎকারের কারণেই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ২৪ বছরের চাকরিজীবনে বহু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করেছেন তিনি। এর মধ্যে অধিকাংশ ছিল ক্লুবিহীন। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। এ হত্যাকাণ্ডটি অনেক জটিল বলেই মনে হচ্ছে। হত্যাকারীদের শনাক্তে একটি ধারণা নিয়ে কিছু দূর এগোনোর পরই সব উল্টে যাচ্ছে। আবার নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাগর-রুনির শিশুপুত্র মেঘকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘটনার পর মেঘ যা বলেছিল, তার ওপর ভরসা করে কিছু প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকেও ইতিবাচক তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সাগর-রুনি পরিবারে হতাশা, আন্তর্জাতিক সংস্থা দিয়ে তদন্ত দাবি : আট দিন পার হলেও সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়া ও কেউ গ্রেফতার না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন সাগর-রুনি পরিবারের সদস্যরা। সাগরের ভগি্নপতি বলেছেন, হত্যারহস্য উদ্ঘাটন ও খুনিদের গ্রেফতারে দেশের গোয়েন্দারা ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে এফবিআই বা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যদের নিয়ে এসে এ হত্যারহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে। আমরা জানতে চাই_ কে বা কারা এ নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ঘটাল।

নিহত সাংবাদিক সাগরের বৃদ্ধ মা সালেহা মুনীর বলেন, 'আমার একমাত্র ছেলেটাকে এভাবে হত্যা করল, আর এতদিনেও খুনিদের ধরতে পারল না পুলিশ_ এটা মানতে কষ্ট হয়। ছেলে যে কারণেই খুন হোক, আমরা প্রকৃত ঘটনা জানতে চাই। যাতে বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেওয়া না হয়।' তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রীই শেষ ভরসা। আমি তার কাছে ছেলে আর ছেলের স্ত্রী হত্যার বিচার চাই। ন্যায়বিচার চাই।

এদিকে রুনির ভাই রোমান জানান, এখনও আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। তবে তদন্তের ওপর আস্থা রাখছি। শিগগিরই খুনিরা গ্রেফতার না হলে পরিবারের সব সদস্য মিলে আত্মাহুতির কথা ভাবছি।

 

By A Web Design