সাংবাদিক দম্পতি হত্যা: পুলিশ এখনও অন্ধকারে

১৮ ফেব্রুয়ারি: সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের পর সাত দিন পেরিয়ে গেছে। তবে এখনও কী কারণে খুন, কারা খুন করেছে_ এ রকম অনেক প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাননি তদন্ত কর্মকর্তারা। বলা যায়, পুরো ঘটনার ব্যাপারে এখনও অন্ধকারে রয়েছে পুলিশ। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার তদন্তসংশ্লিষ্ট এক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে বললেন শুধু দুটি শব্দ_ 'নাথিং নিউ'। এ পর্যন্ত সাংবাদিক দম্পতিকে হত্যায় জড়িত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুনির আঙ্গুলের ছাপ অস্পষ্ট। এদিকে ঘটনার পরপরই আটক রশিদ লজের নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল, হুমায়ুন কবীর ও ম্যানেজার আবু তাহেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সাত দিন পরও খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিহত রুনির মা নুরুন্নাহার মির্জা। অবিলম্বে খুনিরা গ্রেফতার না হলে আমরণ অনশনের হুমকি দিয়েছেন রুনির মা। তদন্ত সূত্র জানায়, সম্ভাব্য বিভিন্ন বিষয় আমলে নিয়ে সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত চলছে। এ পর্যন্ত সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার প্রায় অর্ধশত মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু হত্যার মোটিভ (উদ্দেশ্য) সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পেশাগত কোনো কারণে তারা খুন হয়েছেন কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য সাগর সরওয়ারের লেখা পাঁচটি বই, বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রকাশিত-প্রচারিত প্রতিবেদন, তাদের নেওয়া একাধিক ব্যক্তির সাক্ষাৎকার পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এদিকে মামলার তদন্তের সঙ্গে জড়িত পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'নাথিং নিউ'। মামলার তদন্ত মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) ন্যস্ত হলেও থানা পুলিশ, র্যাব, সিআইডি ও পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) একসঙ্গে রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে।
হত্যা পরিকল্পিত :এক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হত্যাকারীদের প্রথমে অপেশাদার মনে করা হলেও তদন্ত এখন তা সমর্থন করছে না। তবে হত্যায় জড়িতরা সাগর-রুনির পূর্বপরিচিত। এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই তারা বাসায় প্রবেশ করে। ঘটনার সময় তাদের (খুনি) মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। পাশাপাশি খুনিরা এমন কোনো প্রমাণ রেখে যায়নি, যা তাদের শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে। রান্নাঘরের গ্রিল ভাঙাটাও ছিল পরিকল্পিত। এতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ডাকাতি বা চুরি হিসেবে মনে হতে পারে।
সূত্র জানায়, সাগর ও রুনির মোবাইল ফোনে যারা কথা বলেছেন, তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। যারা কথা বলেছেন, তাদের অবস্থান ছিল ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে। সবকিছু মিলে পুলিশ ও গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন_ সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড ছিল সুপরিকল্পিত।
আঙ্গুলের ছাপ অস্পষ্ট :সাংবাদিক দম্পতি হত্যার ঘটনায় ফিঙ্গার প্রিন্ট (আঙ্গুলের ছাপ) প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সিআইডি। বৃহস্পতিবার রাতে তদন্ত সংস্থা ডিবির কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'আলামত অস্পষ্ট'। সাগর ও রুনির হত্যাকা স্থল রশিদ লজের ফ্ল্যাট থেকে হাত-পায়ের ছাপসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছিল সিআইডি। তবে সংগ্রহ করা এসব আলামত থেকে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা মেলেনি। ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে অনির্ধারিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিবির ওই কর্মকর্তা বলেন, ফলাফল (ফিঙ্গার প্রিন্ট) পেতে একটু সময় তো লাগবেই।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুুল কাহার আকন্দ 'অস্পষ্ট ছাপ' সম্পর্কে বলেন, ঘটনাস্থল যেভাবে সুরক্ষার কথা ছিল, সে অবস্থায় পাওয়া যায়নি। সেখানে লোকজনের ব্যাপক যাতায়াত হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলামতই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে উদ্ধার করা আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে স্পষ্ট কিছুই পাওয়া যায়নি।
জব্দ তালিকা ডিবির কাছে :সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তভার আনুষ্ঠানিকভাবে ডিবির ওপর ন্যস্ত হওয়ার পর এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জব্দ করা বিভিন্ন আলামত নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে সংস্থাটি। দায়িত্ব পাওয়ার পর গতকাল শুক্রবার তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরির্দশন করেছে।
ডিবির এডিসি মেহেদী হাসান জানান, প্রথম দিন যে আলামত উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে, তা ডিবির হেফাজতে নেওয়া হয়ছে। তদন্তের স্বার্থে আরও আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্ত কাজ অব্যাহত জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা যায়নি।
আটক ৩ জন মুক্ত :পশ্চিম রাজাবাজারের রশিদ লজের ফ্ল্যাট থেকে সাগর-রুনির লাশ উদ্ধারের পর ওই বাড়িটির নিরাপত্তাকর্মী হুমায়ুন কবির, পলাশ রুদ্র পাল ও ম্যানেজার আবু তাহেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছিল পুলিশ। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ডিবির ডিসি মাহবুবর রহমান ওই তিন জনকে ছেড়ে দেওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে মামলা ও তদন্তের প্রয়োজনে তাদের আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
মামলার বাদী নিহত রুনির ছোট ভাই নওশের আলম রোমান জানিয়েছেন, গতকাল কোনো পুলিশ কর্মকর্তা তাদের কাছে কোনো তথ্য সংগ্রহের জন্য যোগাযোগ করেননি। মামলার তদন্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, মামলার তদন্ত নিয়ে আমরা এখনও কোনো সংশয় প্রকাশ করি না। আমাদের দাবি, খুনিরা যেন অচিরেই ধরা পড়ে।
১০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাতে রাজাবাজারের ৫৮/এ/২ নম্বর ভবনের (রশিদ লজ) পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে (এ-৪) নৃশংসভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি। এ ঘটনায় রাজধানীসহ দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এ বিষয়ে পরদিন শেরেবাংলানগর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
আলামতের খোঁজে : গতকাল শুক্রবার সকালে হত্যাকাণ্ডের আলামতের জন্য সিআইডি ও র্যাবের দুটি টিম পৃথকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা আলামত খোঁজার জন্য ভবনের আশপাশ এলাকা পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি সাগর-রুনির ফ্ল্যাটের রান্নাঘরে কাটা গ্রিল আবারও পরীক্ষা করে দেখেছেন গোয়েন্দা দলের সদস্যরা। র্যাব ও সিআইডি ঘটনাস্থল থেকে নতুন করে কোনো আলামত সংগ্রহ করতে পারেনি বলে জানা গেছে।
আমরণ অনশনের হুমকি রুনির মায়ের : হত্যাকাণ্ডের সাত দিন পরও খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিহত সাংবাদিক মেহেরুন রুনির মা নুরুন্নাহার মির্জা। তিনি মেয়ে ও জামাতার হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার দাবি করেছেন। যদি তা না হয় আমরণ অনশনে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। গতকাল শুক্রবার রাজাবাজারের নিজ বাসায় সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
নুরুন্নাহার মির্জা বলেন, আমরা এখনও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের ওপর আস্থা রাখছি। তবে এতদিনেও খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৪৮ ঘণ্টার কথা বলেছিলেন, কিন্তু সে সময়ের মধ্যে খুনিরা গ্রেফতার হয়নি। তিনি বলেন, আমার মেয়েকে যে কারণেই খুন করা হোক আমি তা জানতে চাই। আমি সুবিচার চাই। খুনিদের খুঁজে বের করে সুবিচার নিশ্চিত করা না হলে আমি আমরণ অনশন শুরু করতে বাধ্য হবো। কিন্তু এরপরও যদি খুনিরা গ্রেফতার না হয় তবে আমার মৃত্যুকেই আমি শ্রেয় মনে করব। সন্তান হারিয়ে কোনো মা এভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। আমিও পারব না।

