হোমপেজ জাতীয় সাংবাদিক দম্পতি হত্যা: মামলা ডিবিতে

সাংবাদিক দম্পতি হত্যা: মামলা ডিবিতে

 
 

১৭ ফেব্রুয়ারি: সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার ৬ দিন অতিবাহিত হলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দৃশ্যত জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। বরং কথার ফুলঝুরি দিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতাকে আড়ালের চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ঘটনার দিনই (শনিবার) দুপুর ১২টার দিকে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, '৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।' ওই সময়ের মধ্যে খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আত্মপক্ষ সমর্থন করে ফের সাংবাদিকদের বলেন, কৌশলগত কারণে ওই সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে তিনি জানান, যে কোনো মুহূর্তে রহস্য উন্মোচিত হবে। গত সোমবার পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সব সময় বেঁধে দেওয়া সময়ে তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয় না। তবে সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যে কোনো সময় রহস্য উন্মোচন হবে।

এদিকে গত মঙ্গলবার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) মনিরুল ইসলাম বলেন, শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে আমরা কাউকে গ্রেফতার করব না। একই ঘটনায় পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইমাম হোসেন বলেছিলেন, থানা পুলিশ এ ঘটনায় কোনো মিডিয়াকর্মীকে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। অন্য কোনো সংস্থা করেছে কি-না তা তিনি নিশ্চিত নন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের পরস্পরবিরোধী এমন বক্তব্যে সৃষ্টি হয়েছে ধূম্রজাল। এমনি অবস্থায় গতকাল সাংবাদিক দম্পতি হত্যা মামলা ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে নবীন আইনজীবীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তদন্তে কোনো ধরনের ত্রুটি হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া গতকাল ডিসি ডিবি মনিরুল ইসলাম ফের মন্তব্য করেন, সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের নানামুখী কথায় নতুন নতুন নাটক ও রহস্যের সৃষ্টি হচ্ছে। ৬ দিন পরও তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের এমন বক্তব্যে তদন্তকারীদের সমন্বয়হীনতার বিষয়টিই যেন প্রকাশ পাচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় ডাকাতি-চুরির নাটক মঞ্চস্থের আশঙ্কাও করছে কেউ কেউ।

অনেকের আশঙ্কা, প্রভাবশালীদের চাপে মামলাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টাও চলছে। সাগর-রুনির হত্যা ঘটনা তদন্তে বিলম্ব ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া সময়সীমা পার হলেও খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নেতারাও। এদিকে খুনিদের শনাক্তে গতকাল পর্যন্ত কোনো আলামতের ডিএনএ করানো হয়নি। তবে সিআইডি যাবতীয় আলামত ডিবির কাছে হস্তান্তর করেছে।

গত শুক্রবার রাতে কোনো এক সময় রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর এবং তার স্ত্রী এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রুনি।

মামলা ডিবিতে :সাংবাদিক দম্পতির হত্যার ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা মামলাটি গতকাল ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ৩৫ জনকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা স্বীকারও করেছে। তবে গ্রেফতারের কথা স্বীকার করেনি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মনিরুল ইসলাম গতকাল এক অনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পুলিশের নজরদারির বাইরে যেন সন্দেহভাজনরা যেতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রুনি আগে খুন হয়েছেন। পরে খুন হন সাগর।

পুলিশের হাতে আটক ব্যবসায়ী রিয়াজ উদ্দিন ও শাহীন গোয়েন্দা হেফাজতে রয়েছেন। তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। গত বুধবার পশ্চিম রাজাবাজার থেকে হোটেল ও ডিশ ব্যবসায়ী রিয়াজ উদ্দিনকে ডিবি পরিচয়ে আটক করা হয়। একই রাতে আটক করা হয় সাংবাদিক দম্পতির বাসার অস্থায়ী গৃহকর্মী জাহানারা ও তার ছেলে শাহীনকে।

ব্যবসায়ী রিয়াজের ছোট বোনের স্বামী আবুল কাশেম বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের পর রিয়াজকে ছেড়ে দেওয়া হবে। হোটেল ব্যবসার পাশাপাশি তিনি ডিশ ব্যবসা করতেন।

জিজ্ঞাসাবাদ, আটক ও গ্রেফতার নিয়ে ধূম্রজাল : সাংবাদিক দম্পতি হত্যার পর থেকেই সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ, আটক ও গ্রেফতার নিয়ে রহস্যজনক আচরণ করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। একাধিক ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় ডিবি হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি স্বীকার করছে না। অনেক ক্ষেত্রে কৌশলী ভূমিকা নিয়ে তারা বলছেন, জড়িত সন্দেহে অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলার বাদী রুনির ভাই নওশের আলম বলেন, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে একাধিক দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। হুমকির বিষয়ে আলম বলেন, দু'দিন আগে গ্রামের একটি ছেলে দুষ্টুমি করে আমার ফোনে কথা বলে হুমকি দেয়। ওটা কোনো গুরুতর বিষয় নয়। এদিকে ঘটনার পর তাৎক্ষণিক পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, সাংবাদিক দম্পতির বাসা থেকে কোনো মালপত্র খোয়া যায়নি। মামলার এজাহারেও মালপত্র খোয়া যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। পরে জানা যায়, ৯ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, সাগরের একটি মোবাইল সেট ও ল্যাপটপ খোয়া যায়।

শিগগিরই খুনিদের গ্রেফতারের দাবি : শিগগিরই খুনিদের গ্রেফতার করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) আয়োজিত এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে সাংবাদিক নেতারা এ দাবি জানান। তারা বলেন, খুনি যত শক্তিশালীই হোক, তার পরিচয় সে খুনি। সাংবাদিক দম্পতি খুনের বিকৃত তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করা হলে তার পরিণতি শুভ হবে না বলেও পুলিশের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা বলেন, তারা সরকারকে ৭২ ঘণ্টার সময় দিয়েছেন। আজ শুক্রবার তা শেষে হবে। এর মধ্যে খুনিদের ধরতে পুলিশ ব্যর্থ হলে তারা সব সাংবাদিককে নিয়ে একটি যুগপৎ আন্দোলনে যাবেন। তিনি খুনিদের বিচার নিশ্চিত করতে সব সাংবাদিককে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। কোনো মহলের খাওয়ানো তথ্যে বিভ্রান্ত না হতে তিনি সংবাদকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানান। অনুষ্ঠানে ডিআরইউ ও ক্র্যাব নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

 

By A Web Design