নতুন প্রজন্মের হাতে বেশি বেশি বই তুলে দিনঃ প্রধানমন্ত্রী

২ ফেব্রুয়ারি: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন ও অমর একুশের চেতনা চিরদিন সমুজ্জ্বল রাখতে নতুন প্রজন্মকে নতুন বইয়ের অবারিত ভাণ্ডারের সঙ্গে পরিচিত করতে বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বিকেলে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১২ উদ্বোধনকালে তিনি এ আহ্বান জানান। নতুন প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস জানার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সঠিক ইতিহাস জানতে পারলেই নতুন প্রজন্ম ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। ইতিহাস সচেতনতা গড়ে তুলতে লেখক-প্রকাশকদেরদায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'আপনাদের সন্তানদের হাতে বেশি বেশি বই তুলে দিন এবং সমাজকে আলোকিত করায় অবদান রাখুন।'
শেখ হাসিনা সৃজনশীল লেখনীর মাধ্যমে একুশের চেতনা সমুন্নত রাখতে ও বিপথগামীদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রয়াস চালাতে কবি ও সাহিত্যিকদের প্রতি আহ্বান জানান। গণতন্ত্র এবং দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশবিরোধী শত্রু ও ষড়যন্ত্রকারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, একুশ হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গৌরবের উৎসমূল এবং এই চেতনার প্রতিমূর্তি হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এই গ্রন্থমেলা বাঙালির সাংস্কৃতিক উজ্জীবনের উজ্জ্বল স্মারক ও দেশের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব এবং যা বাঙালির আত্মউপলব্ধি, আত্মআবিষ্কার ও আত্মপ্রকাশের উৎসস্থল।
তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে জাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল তা বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। বাংলা একাডেমীর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইমেরিটাস আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ কবি, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক এবং লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের সাবেক অধ্যাপক উইলিয়াম রাডিচি। অন্যান্যের মধ্যে তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।
শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বসমাজ এখন শ্রদ্ধার সঙ্গে ভাষা আন্দোলনে আমাদের ত্যাগকে স্মরণ করে। বাঙালির এ আত্মোৎসর্গ অন্যদেরকে তাদের মাতৃভাষা সংরক্ষণে প্রেরণা জোগানোর পাশাপাশি বিশ্বের বহু বিপন্ন ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে সহায়তা করছে।
মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে তার সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা উলেল্গখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মাতৃভাষা গবেষণা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মানসম্পন্ন বই প্রকাশের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, গ্রন্থমেলা উপলক্ষে প্রতি বছর বহু বই বের হয়। কিন্তু সংখ্যার চেয়ে মানের দিকে আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শেখ হাসিনা লেখকদের সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করতে তাদের অধিকার সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং লেখক ও প্রকাশকদের কপিরাইট সংরক্ষণে আরও বেশি উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সংশিল্গষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা পেছনের ইতিহাসের উলেল্গখ করে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের কথা স্মরণ করেন। ওই আন্দোলন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে।
তিনি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অবদানের কথাও স্মরণ করেন। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে প্রথমবারের মতো দাবি উত্থাপন করেন এই মহান ভাষাসংগ্রামী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমী প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে। এটাই হচ্ছে দেশের বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক এবং বিভিন্ন নাট্যদলের প্রথম বিশাল সমাবেশ। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু এ মহাসম্মেলনে বাঙালি জাতিসত্তা ও বাঙালি সংস্কৃতির নীতি-আদর্শ তুলে ধরেন। বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধুর সে পথই অনুসরণ করছে।
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার বাংলা একাডেমীর গবেষণা কার্যক্রম জোরদারে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তৃণমূল পর্যন্ত সাংস্কৃতিক কর্মকা ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি জাদুঘর এবং বিশিষ্ট লেখকদের নিয়ে আরেকটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তিনি বলেন, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ পেয়েছি। এ ভাষা এখন আন্তর্জাতিক সম্মান পেয়েছে। বাংলাকে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা করার চেষ্টা চলছে। দেশে ভাষাচর্চার জন্য ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হবে। সেখানে বিভিন্ন দেশের ভাষা নিয়ে গবেষণা হবে।

