জাতীয়
যৌথ পানি বণ্টন: বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ
২২ ফেব্রুয়ারি: যৌথ নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একটি শীর্ষ পর্যায়ের সূত্রে এ কথা জানা গেছে। এ বিষয়ে খুব শিগগিরি একটি বৈঠকের আয়োজন করা হবে বলে ওই সূত্র জানায়। যৌথ নদীর পানি বণ্টন প্রশ্নে ভুটানেও আলাপ-আলোচনা চলছে তবে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মতো এ দেশটির জনগণ এসব ইস্যুতে তেমন সোচ্চার নয়।
বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে যখন রেল, সড়ক এবং সমুদ্রপথে কানেক্টিভিটি প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করা হচ্ছে তখন যৌথ নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে সম্ভাব্য আলোচনার খবর এলো।
আঞ্চলিক নদীগুলোর পানি বণ্টনের বিষয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দিপনা রয়েছে, সে তুলনায় আবার ভারত অনেকটা অনাগ্রহী।
সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে যৌথ নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিন দেশ পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে, পরবর্তীতে চীনকেও এতে যুক্ত করা হতে পারে। ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চল দিয়ে প্রবাহমান খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তিস্থল হচ্ছে চীন এবং এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর একটি।
তবে অনেকে মনে করছেন, চীন সম্প্রতি ব্রহ্মপুত্র নদে বেশ কয়েকটি বাঁধ দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এবং তাতে ভারতের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দিল্লি এখন প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ নদীর পানি বণ্টনের চিন্তা করছে। এর মাধ্যমে তারা চীনের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে।
সাংবাদিক দম্পতি হত্যা: ১০ দিনেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি

২১ ফেব্রুয়ারি: সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার-মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন পার হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। আলোচিত এ জোড়া খুনের সঙ্গে জড়িত কাউকে চিহ্নিতও করা যায়নি। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজি) পর এবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারও আশার বাণী শোনালেন। গতকাল সোমবার তিনি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাংবাদিকদের বলেন, 'আমাদের ওপর আস্থা রাখুন।' এদিকে পুলিশের তদন্ত টিম গতকাল সকালে মামলার বাদীকে নিয়ে ঘটনাস্থল (রশিদ লজের যে ফ্ল্যাটে সাগর-রুনি খুন হন) পরিদর্শন করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সব ধরনের কৌশল কাজে লাগিয়ে তদন্ত চালাচ্ছেন।
ঘটনাস্থলে পুলিশের তদন্ত দল : গতকাল সকালে তেজগাঁও জোনের উপ-কমিশনার ইমাম হোসেনের নেতৃত্বে এক দল পুলিশ মামলার বাদী রুনির ভাই নওশের আলম রোমানকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা সাগর-রুনির বেডরুমের ভিডিওচিত্র ধারণ করেন। এছাড়া সাগরের ব্যবহৃত পোশাকের ব্যাপারে খোঁজ নেন তারা। তবে কী কারণে এ পরিদর্শন তা স্পষ্ট করে বলেননি পুলিশ কর্মকর্তারা। ঘটনাস্থলে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা ইমাম হোসেন জানান, কিছু বিষয় আমাদের জানার ছিল। তাই ঘটনাস্থলে বাদীকে নিয়ে এসেছি। যে সব বিষয়ে আমাদের সন্দেহ ছিল এর মাধ্যমে সে সব দূর হবে বলে আশা করছি।
রুনির ভাই রোমান বলেন, তদন্ত দল প্রায় আধা ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করে। এ সময় পুলিশ তার কাছে জানতে চায়, সাগরের কোনো শার্ট-প্যান্ট খোয়া গেছে কি-না। সাগরের ক'টি শার্ট-প্যান্ট সে হিসাব তার জানা থাকার কথা নয় বলে তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন। অবশ্য তিনি পুলিশকে বলেছেন, সাগরের শার্ট দেখলে চিনতে পারব। ওই সময় বাসা থেকে পুলিশ মেঘের কিছু পোশাক-পরিচ্ছদ নেয় বলে জানান রোমান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, সাগর-রুনিকে হত্যার পর স্বাভাবিকভাবেই খুনিদের শরীর রক্তাক্ত হয়েছে। এ অবস্থায় খুনিরা তাদের পরনে থাকা জামা-কাপড় নিয়ে কোনোভাবেই বাইরে যেতে পারে না। ধারণা করা হচ্ছে খুনিরা সাগরের পোশাক পরেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছে। যদি এমন হয় তাহলে তারা বেরুনোর সময় ফ্ল্যাটের অন্য লোকদের সন্দেহ অনেকটা এড়াতে পেরেছে। সাগরের জামা-কাপড় নাড়াচাড়া করার সময় খুনিদের কোনো হাতের ছাপ লেগে ছিল কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ এতদিনে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে কোনো কথা বলেননি। গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি করতে গেলে সাংবাদিকরা হত্যা মামলায় কাউকে চিহ্নিত কিংবা গ্রেফতার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে কি-না জানতে চান ডিএমপি কমিশনারের কাছে। তিনি তা জানাতে না পারলেও পুলিশের ওপর আস্থা রাখতে বলেছেন। ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ বলেন, 'সাগর-রুনির পরিবার ও সাংবাদিকরা এ তদন্ত কাজ যতটুকু আন্তরিকতা দিয়ে করত, আমরা তাদেরও (তাদের আন্তরিকতা) ছাপিয়ে যাব। আমাদের ওপর আস্থা রাখুন।' হত্যা মামলাটি 'দ্রুততম' সময়ে শেষ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বেনজীর আহমেদ বলেন, 'আমরা ১১ তারিখের পর থেকে (যেদিন সাগর-রুনির লাশ উদ্ধার করা হয়) সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তদন্ত করছি।'
আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডে কাউকে সন্দেহ বা শনাক্ত করতে পেরেছেন কি-না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ডিএমপি কমিশনার কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
একুশে ফেব্রুয়ারি মাঠে থাকবে ৩ হাজার র্যাব
২০ ফেব্রুয়ারি : আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সোমবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাজধানীতে জনসাধারণের চলাচল ও সব ধরনের যানবাহনে নিরাপত্তায় তিন হাজার র্যাব সদস্য মাঠে থাকবে। একুশে উদযাপন উপলক্ষে ডিএমপি কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। সে সঙ্গে অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন করতে প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার কথাও জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
সোমবার সকাল ১১ টায় ডিএমপি কমিশনার বেনজির আহমেদ, র্যারের ডিজি মোখলেসুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন।
ডিএমপির নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে, নাজিম উদ্দিন সড়ক-বাবুপুরা সড়ক (পুরানো যাদুঘরের সামনের রাস্তা), কলেজ সড়ক (ফজলুল হক হলের পূর্ব পার্শ্বের রাস্তা), আব্দুল গণি সড়ক ও তোপখানা সড়ক এলাকার জনসাধারণ আজিমপুর কবরস্থানে যাওয়ার জন্য শিক্ষা ভবন ক্রসিং দিয়ে দোয়েল চত্বর, বাংলা একাডেমী-টিএসসি’র মোড়-নীলক্ষেত সড়ক-নিউ মার্কেট ক্রসিং-নিউ মার্কেট ১নং গেট-পিলখানা সড়ক হয়ে কবরস্থানের উত্তর গেট ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।
এছাড়া শহিদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণী (পার্ক এভিনিউ), সেগুনবাগিচা ও শাহবাগ এলাকার জনসাধারণ শাহবাগ ক্রসিং দিয়ে টিএসসির মোড়-নীলক্ষেত সড়ক-নিউমার্কেট ক্রসিং-নিউমার্কেট ১নং গেট-পিলখানা সড়ক হয়ে কবরস্থানের উত্তর গেট দিয়ে কবস্থানে ঢুকবেন।
এদিকে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বকশীবাজার, পলাশী, ঢাকেশ্বরী, লালবাগ, উর্দু রোড, আজিমপুর ও চকবাজার এলাকার জনসাধারণ সলিমুল্লাহ এতিমখানা-আজিমপুর মেটারনিটি-আজিমপুর সড়ক-ছোট দায়রা শরীফ-আজিমপুর বটতলা বিশ্ববিদ্যালয় স্টাফ কোয়ার্টার-নিউ পল্টন লেন হয়ে গোরস্তানের উত্তর গেট দিয়ে কবরস্থানে ঢুকবেন।
তা ছাড়া আজিমপুর কবরস্থানের সড়ক থেকে যারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যেতে চান তারা আজিমপুর কবরস্থানের মূল গেট থেকে আজিমপুর সড়ক-আজিমপুর বেবী আইসক্রিম মোড়-পলাশী ক্রসিং-এসএম হল এবং জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা দিয়ে শহিদ মিনারে যাবেন।
বাবুপুরা সড়ক, নাজিম উদ্দিন সড়ক, বকশী বাজার, পলাশী, চকবাজার, উর্দু রোড ও ঢাকেশ্বরী সড়ক এলাকার জনসাধারণ যারা কবরস্থানের দিকে না গিয়ে সরাসরি শহিদ মিনারে যেতে চান তারা পলাশী ক্রসিং-এসএম হল এবং জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা দিয়ে শহিদ মিনারে যাবেন।
একইভাবে আব্দুল গণি সড়ক, তোপখানা সড়ক ও শহিদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণি (পার্ক এভিনিউ) এলাকার জনসাধারণ যারা গোরস্তানে না গিয়ে শহিদ মিনারে যেতে চান তারা শিক্ষা ভবন ক্রসিং-দোয়েল চত্বর ক্রসিং-বাংলা একাডেমী-টিএসসি মোড়-নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি মোড়-পলাশী মোড়-এসএম হল এবং জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা দিয়ে শহীদ মিনার যাবেন।
ওদিকে বাংলামটর ও শেরাটন ক্রসিং হয়ে যারা শহিদ মিনার যেতে চান তারা শাহবাগ ক্রসিং হয়ে টিএসসির মোড়-নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি মোড়-পলাশী মোড়-এসএম হল এবং জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা দিয়ে শহিদ মিনার যাবেন।
এছাড়া কাটাবন হয়ে যারা শহিদ মিনার যেতে চান তারা কাটাবন ক্রসিং হয়ে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি মোড়-পলাশী মোড়-এসএম হল এবং জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা দিয়ে শহিদ মিনার যাবেন। যেসব ছাত্রছাত্রী ও জনসাধারণ রোকেয়া হল, সামসুন্নাহার হল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন এলাকা হতে সরাসরি শহিদ মিনারে যেতে চান তারা নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি মোড়-পলাশী মোড়-এসএম হল এবং জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা দিয়ে শহিদ মিনার যাবেন।
এসব রাস্তা দিয়ে সোমবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। গোরস্তান এবং শহিদ মিনারে যারা শ্রদ্ধার্ঘ ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে যাবেন তারা অন্যদের অসুবিধার কথা ভেবে রাস্তায় বসা বা দাঁড়ানো থেকে বিরত থাকবেন।
সবার চলাচলের সুবিধার্থে উল্লিখিত রাস্তায় কোনো ধরনের প্যান্ডেল তৈরি না করার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশ সবার সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীসহ সারাদেশে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে র্যাব। এবারের তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থায় সারাদেশে তিন হাজার র্যাব সদস্য মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া র্যাবের পোশাকধারী সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকে র্যাবের গোয়েন্দা সদস্য নিয়োজিত থাকছে। স্পর্শকাতর স্থানের নিরাপত্তা কার্যক্রমকে পর্যাপ্ত সিসিটিভির মাধ্যমে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এসব নিরাপত্তা কার্যক্রম সিসিটিভি মনিটরিং সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়াও র্যাবের বোম্ব স্কোয়াড টিম এবং ডগ স্কোয়াডের মাধ্যমে র্যাবের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার, আজিমপুর কবরস্থান এলাকাসহ বিভিন্ন কবরস্থানে জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করার লক্ষে ওই এলাকায় কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ওই এলাকাকে তিনটি সেক্টর এবং ১০টি অবজারভেশন/চেকপোস্টসহ বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে ছয় শতাধিক র্যাব সদস্য পুলিশের সঙ্গে তিন স্তরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।
এ ছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে শুরু করে সারাদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও যে কোনো ধরনের বিশৃংখলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে যথাযথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আজ

২১ ফেব্রুয়ারি: অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আজ। আমাদের জাতিসত্তা বিকাশের দিন। রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মারক মহান শহীদ দিবস। একইসঙ্গে দিনটি আজ সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও পালিত হবে। একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো: জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া।
দিনটি বাঙালির ভাষা আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অনন্য গৌরবের দিন। স্বজন হারানোর বেদনাদীর্ণ শোকের দিন। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্য রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়ার প্রথম নজির। কালক্রমে সেই শোকের দিন উত্তীর্ণ হয়েছে বাঙালির জাগরণের মহাশক্তির প্রতীক হিসেবে।
১৯৪৮ সালে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির মধ্য দিয়ে যে সংগ্রামের শুরু, বায়ান্নতে সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি রক্তের আখরে। ওই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঢাকার রাজপথে প্রাণ উৎসর্গ করেন সালাম, জব্বার, রফিক, সফিউদ্দিন, বরকতসহ বাংলার বীর তরুণরা। সেই থেকে দিনটি মহান শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারির সেই সকালে বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থাপিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সভা থেকে ডাক আসামাত্রই ১৪৪ ধারা ভাঙতে একের পর এক দশজনের মিছিল বের হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় গেট থেকে। সেদিন বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠেয় প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে পরিষদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিয়ে ছাত্ররা সমবেত হয় মেডিকেল কলেজ হোস্টেল গেটের সামনেও।
সকাল থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার সঙ্গে রক্তাক্ত সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ হঠাৎ মেডিকেল হোস্টেল গেটের সামনে ও বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে জড়ো হওয়া ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ ও আবদুল জব্বার। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সফিউর রহমান, রিকশাচালক আবদুল আউয়াল, অহিউল্লাহসহ অসংখ্য অজ্ঞাত মানুষ। এ ছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত আবদুস সালাম মারা যান ৭ এপ্রিল।
এদিকে ভাষার জন্য রাজপথের এ আত্মদান গোটা দেশেই আন্দোলনকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেয়। ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি গোটা প্রদেশে হরতাল পালিত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলেও আন্দোলন অব্যাহত থাকে। গণআন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা নতিস্বীকারে বাধ্য হলে বাঙালির আন্দোলনের বিজয় অর্জিত হয়। পাকিস্তান গণপরিষদ ওই বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি গৃহীত সংবিধানের মাধ্যমে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
ভাষা আন্দোলনের মধ্যে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশের যে সংগ্রামের সূচনা ঘটেছিল, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে, কেবল মুক্তিযুদ্ধ নয়, পরবর্তীকালের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামেও এ চেতনা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের শিখা জ্বালিয়েছে। ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’-চিরকালের এ স্লোগান তাই আজও স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। একুশ মানে জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যাবতীয় পশ্চাৎপদতা-তুচ্ছতা-গোঁড়ামি আর সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে শুভবোধের অঙ্গীকার।
ভাষার জন্য বাঙালির বিরল এ আত্মত্যাগ আজ কেবল এ ভূখণ্ডের সীমানায় আবদ্ধ নয়। বিশ্বের সব জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার সংগ্রামেও এ এক অভূতপূর্ব প্রেরণা। ২১ ফেব্রুয়ারি তাই কালের পরিক্রমায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায়ও মহীয়ান হয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের ৩০তম সম্মেলনে ২৮টি দেশের সমর্থনে দিনটিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে একযোগে পালিত হচ্ছে। বাঙালির সুমহান আত্মত্যাগের এ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাই বাঙালি জাতির জন্য এক অনন্যসাধারণ অর্জন। এ গৌরব কেবল বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশেরই নয়, বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৪০ বছর পর আজও একুশের সেই অম্লান চেতনা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়া যায়নি। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দেশের সংবিধানে স্বীকৃত হলেও সর্বস্তরে এ ভাষা চালুর দাবি পুরোপুরি বাস্তবায়নও হয়নি। এখনও উচ্চ আদালতসহ অনেক ক্ষেত্রেই বাংলা অপ্রচলিতই রয়ে গেছে। সর্বস্তর থেকেই আজ দাবি উঠেছে, সাইনবোর্ড, গাড়ির নম্বর প্লেটসহ সবক্ষেত্রে বাংলা চালু হোক। ভবিষ্যতে মাতৃভাষা হুমকির মুখোমুখি হয়_ এমনসব কার্যক্রম আইন করে বন্ধ করার।
অবশ্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি ক্ষমতাসীন থাকায় জাতি অনেকটা আশান্বিতও। বিশেষ করে এ সরকারের আমলে বাংলা ভাষা চর্চা ও বিকাশের লক্ষ্যে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শেষ হওয়ায় জাতি উদ্দীপ্ত।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো: জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া পৃথক বাণীতে ভাষার জন্য আত্মদানকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে ভাষা আন্দোলনের চেতনায় শহীদদের স্বপ্নপূরণে দেশ ও জাতির কল্যাণে এগিয়ে আসার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বানও জানান তারা।
মঙ্গলবার সরকারি ছুটি। বাংলাদেশ ও সারাবিশ্ব আজ মৃত্যুঞ্জয়ী বীর ভাষাশহীদদের প্রতি জানাবে তাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। নানা ভাষা, নানা বর্ণ, নানা সংস্কৃতির পাশাপাশি উচ্চারিত হবে কালজয়ী অমর গান- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...।' দেশের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে নিভৃত গ্রাম-গঞ্জে প্রাণ নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তোলা শহীদ মিনার ও স্মৃতিস্তম্ভ সাজবে ফুলে ফুলে।
খুনিরা গ্রেফতার না হলে রুনির পরিবারের আত্মাহুতি

১৯ ফেব্রুয়ারি: 'খুনিদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নইলে আত্মাহুতি'_ এমনটাই ভাবছে সাংবাদিক মেহেরুন রুনির পরিবার। ঘটনার ৮ দিন পরও খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় সাগর-রুনি পরিবারের সদস্যদের মাঝে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। রুনির ভাই নওশের আলম রোমান গতকাল বলেন, 'খুনিদের গ্রেফতার করতে হবে। আমরা ন্যায়বিচার চাই। খুনিদের গ্রেফতার করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত না করা হলে বিকল্প কিছু বিষয়ের কথা ভাবছি। ন্যায়বিচার না পেলে যে কোনো সময় পরিবারের সবাই আত্মাহুতি দিতে প্রস্তুত। আমরা মানবাধিকার কমিশনে যাওয়ার কথাও চিন্তা করছি।'
এদিকে সাগরের বৃদ্ধ মা সালেহা মুনীর বলেন, 'ন্যায়বিচারের দায় প্রধানমন্ত্রীর কাছেই রাখলাম।' সাগরের বোনজামাই অধ্যাপক আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, 'খুনিরা গ্রেফতার না হওয়ায় আমরা হতাশ হয়ে পড়েছি।' প্রয়োজনে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ও এফবিআইর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের এনে রহস্য বের করার দাবি জানান তিনি।
গতকালও এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কোনো অগ্রগতি জানাতে পারেনি পুলিশ। একটি সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত ৯টায় পশ্চিম রাজাবাজার থেকে পুলিশ সন্দেহভাজন দু'জনকে আটক করে জিজ্ঞাসা করেছে। তাদের নাম জানাতে অস্বীকৃতি জানান তদন্ত কর্মকর্তারা।
এদিকে সাংবাদিক দম্পতির হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি বরাবর আবেদন করেছেন মামলার বাদী রুনির ভাই রোমান। রোমান জানান, ঘটনার পর শেরেবাংলা নগর থানায় করা মামলায় কিছু বিষয় বাদ পড়েছে। বাদপড়া কয়েকটি বিষয় মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করেছি। এগুলো হলো_ বাসা থেকে ১১শ' ইউরো, কিছু বাংলাদেশি মুদ্রা (অঙ্ক বলা হয়নি) খোয়া যাওয়া, ১০-১১ ভরি স্বর্ণালঙ্কার না পাওয়ার বিষয়টি। এ ছাড়া তদন্ত কর্মকর্তারা গতকাল রুনিদের পরিবারের কাছে কিছু মালপত্র ফেরত দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সাগরের ল্যাপটপ, অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড, মানিব্যাগ ইত্যাদি।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আলামত দেখে বলা হয়েছিল, খুনিরা 'অপেশাদার'। একই রকম বক্তব্য ছিল লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের। এখন প্রশ্ন উঠেছে_ 'অপেশাদার' খুনি ধরতেই কেন হাবুডুবু খাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী? পেশাদার তদন্ত কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে কেন দীর্ঘ সময় পরও কথিত 'অপেশাদার' খুনিদের গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হচ্ছেন? তদন্ত নিয়ে পুলিশের রহস্যজনক আচরণে জনমনে নানা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। অনেকের জিজ্ঞাসা, খুনিকে শনাক্ত করার পর কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপে পুলিশ মামলাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে কি-না। কারও কারও আশঙ্কা_ সাংবাদিক দম্পতি হত্যার প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে না। 'সাগরের গভীর পানিতেই' নিমজ্জিত থাকবে সাগর-রুনি হত্যা মামলার নেপথ্য রহস্য।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল আবারও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদারকি করছেন, নির্দেশনা দিচ্ছেন। এ মামলা ধামাচাপা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দোষীদের আড়াল করতে প্রভাবশালী কারও চাপ আছে কি-না_ এমন প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে প্রভাবশালী আর কে আছেন?'
হত্যাকাণ্ডের ৮ দিন পার হলেও কোনো খুনিকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এমনকি কাউকে শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি বলে জানানো হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য, সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করে তদন্ত কাজ চলছে। এরপরও পুলিশের পক্ষ থেকে মামলার অগ্রগতি নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো তথ্য না পাওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উল্টো এ ঘটনা নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আগ বাড়িয়ে নানা বক্তব্যের কারণে জনমনে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। থানা থেকে মামলাটি ডিবিতে আসার পরও তদন্তে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে গতকালও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ খুনিদের শিগগিরই গ্রেফতার, সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। আগামী শনিবারের মধ্যে জড়িতরা গ্রেফতার না হলে নেতৃবৃন্দ চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া চাঞ্চল্যকর এ হত্যার বিচার দাবিতে গতকালও বিভিন্ন সংগঠন নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে।
যেখানে মিলছে না 'চোর-ডাকাত' তত্ত্বের হিসাব : মামলা তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, কয়েকটি কারণ সামনে নিয়ে আমরা মামলাটির তদন্তে নেমেছি। এর মধ্যে একটি হলো, ফ্ল্যাটের পেছনের জানালা দিয়ে কোনো দুর্বৃত্ত চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্যে সাংবাদিক দম্পতির বাসায় প্রবেশ করেছিল কি-না। আমরা পাতলা গড়নের এক ব্যক্তি দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছি, জানালার কাটা অংশ ব্যবহার করে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করা সম্ভব। ওই কর্মকর্তাই জানান, চোর-ডাকাত ঘরে প্রবেশ করলেও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে মিলছে না। তাহলো, হত্যার পর মালামাল নিয়ে ওই জানালা দিয়ে দুর্বৃত্তরা বের হলে কোথাও রক্তের দাগ বা অন্যান্য আলামত থাকত। এ ছাড়া সাংবাদিক দম্পতির বাসা থেকে খোয়া যাওয়া মালপত্র দেখেও সন্দেহ রয়েছে_ প্রকৃত অর্থেই চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল কি-না। মোবাইল, ল্যাপটপসহ বাসার গুরুত্বপূর্ণ মালপত্র অক্ষতই রয়ে গেছে। এমনকি সাংবাদিক দম্পতির সাড়ে পাঁচ বছরের ছেলে মেঘ ঘটনার পর জানিয়েছিল, তার মা-বাবাকে হত্যাকারী দুই ব্যক্তিকে এর আগে সে পিকনিকে দেখেছিল। দুই ব্যক্তি বাসা থেকে যাওয়ার পর ফ্ল্যাটের মূল দরজা মেঘ বন্ধ করে। এ বক্তব্য সঠিক হলে সাংবাদিক দম্পতির ফ্ল্যাটে চোর-ডাকাত তত্ত্বের হিসাব মিলছে না।
মামলা ডিবিতে গেলেও তদন্তে অগ্রগতি নেই : সাংবাদিক দম্পতি হত্যার ৩৬ ঘণ্টা পর রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি থানা থেকে ডিবিতে এলেও তদন্ত নিয়ে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি নেই। হত্যাকাণ্ড বিষয়ে ডিবির পক্ষ থেকে গত কয়েক দিন থেকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করা হতো। গতকাল থেকে সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে গোয়েন্দা সদস্যরা কথা বলতে চাচ্ছেন না।
তদন্ত নিয়ে নানামুখী বক্তব্য : সাংবাদিক দম্পতি হত্যার ঘটনার দু'দিন পর ১৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদর দফতরের নিয়মিত ক্রাইম কনফারেন্সে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছিলেন, 'তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। খুব শিগগিরই এর রহস্য উন্মোচন করা হবে।' একদিন পর মঙ্গলবার কোস্টগার্ডের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেছিলেন, 'খুব শিগগিরই আপনারা এ ব্যাপারে ইতিবাচক সংবাদ শুনবেন।' পরদিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের বক্তব্যে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেছেন, গোয়েন্দা পুলিশ হত্যার পেছনে একাধিক কারণের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ৬টি কারণ সামনে রেখে তদন্তকাজ চলছে।
এখনও হত্যার মোটিভ খুঁজছে পুলিশ : সাগর-রুনি হত্যার মোটিভ নিয়ে পুলিশ এখনও ঘোর অন্ধকারে। পারিবারিক বা টাকা-পয়সা নিয়ে বিরোধের কোনো তথ্য গতকাল পর্যন্ত মেলেনি। এ অবস্থায় পুলিশ সাগরের লেখা ৫টি বই, ২০০৭ সাল পর্যন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট, মাছরাঙা টেলিভিশনের বেশ কয়েকটি টক শো এবং পার্বত্য অঞ্চলের এক নেতার সাক্ষাৎকার (সাগরের নেওয়া) সংগ্রহ করেছে। এসব রিপোর্ট, টক শো এবং সাক্ষাৎকারের কারণেই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ২৪ বছরের চাকরিজীবনে বহু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করেছেন তিনি। এর মধ্যে অধিকাংশ ছিল ক্লুবিহীন। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। এ হত্যাকাণ্ডটি অনেক জটিল বলেই মনে হচ্ছে। হত্যাকারীদের শনাক্তে একটি ধারণা নিয়ে কিছু দূর এগোনোর পরই সব উল্টে যাচ্ছে। আবার নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাগর-রুনির শিশুপুত্র মেঘকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘটনার পর মেঘ যা বলেছিল, তার ওপর ভরসা করে কিছু প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকেও ইতিবাচক তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সাগর-রুনি পরিবারে হতাশা, আন্তর্জাতিক সংস্থা দিয়ে তদন্ত দাবি : আট দিন পার হলেও সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়া ও কেউ গ্রেফতার না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন সাগর-রুনি পরিবারের সদস্যরা। সাগরের ভগি্নপতি বলেছেন, হত্যারহস্য উদ্ঘাটন ও খুনিদের গ্রেফতারে দেশের গোয়েন্দারা ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে এফবিআই বা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যদের নিয়ে এসে এ হত্যারহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে। আমরা জানতে চাই_ কে বা কারা এ নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ঘটাল।
নিহত সাংবাদিক সাগরের বৃদ্ধ মা সালেহা মুনীর বলেন, 'আমার একমাত্র ছেলেটাকে এভাবে হত্যা করল, আর এতদিনেও খুনিদের ধরতে পারল না পুলিশ_ এটা মানতে কষ্ট হয়। ছেলে যে কারণেই খুন হোক, আমরা প্রকৃত ঘটনা জানতে চাই। যাতে বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেওয়া না হয়।' তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রীই শেষ ভরসা। আমি তার কাছে ছেলে আর ছেলের স্ত্রী হত্যার বিচার চাই। ন্যায়বিচার চাই।
এদিকে রুনির ভাই রোমান জানান, এখনও আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। তবে তদন্তের ওপর আস্থা রাখছি। শিগগিরই খুনিরা গ্রেফতার না হলে পরিবারের সব সদস্য মিলে আত্মাহুতির কথা ভাবছি।


জাতীয়