শেয়ারবাজারঃ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি ২২ হাজার কোটি টাকা
১৬ ফেব্রুয়ারি:পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক ধসের কারণে ১৭ লাখ ৮৪ হাজার বিনিয়োগকারীর মোট ক্ষতি হয়েছে ২২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী রয়েছেন ১৫ লাখ ২৬ হাজার। তাদের নিজস্ব বিনিয়োগ ১ থেকে ১০ লাখ টাকা। অন্যদিকে ১০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ২ লাখ ৫৮ হাজার। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পোষাতে গঠিত বিশেষ স্কিম প্রণয়ন কমিটি সম্প্রতি সরকারের কাছে জমা দেওয়া তাদের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে এসব তথ্য দিয়েছে। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওর হিসাব যাচাই করে কমিটি ওই তথ্য পেয়েছে। বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়েছেন গত এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে।
বিশেষ স্কিম কমিটি তাদের প্রতিবেদনে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণের সুদ দাতা-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মওকুফের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আইপিওতে ২০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণসহ আরও কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির এই প্রতিবেদন নিয়ে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ স্কিম চূড়ান্ত হতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
কমিটির এসব সুপারিশ সম্পর্কে মতামত জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং এসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দাতা-গ্রাহক ভিত্তিতে সুদ মওকুফ করা হলে এসইসির কোনো ভূমিকা থাকবে না। সেটা তো ব্যাংকই করতে পারে। তিনি বলেন, ঢালাওভাবে প্রণোদনা না দিয়ে সত্যিকারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। ঢালাওভাবে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন।
পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিকতা রোধ, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) গত বছরের ২৩ নভেম্বর বিশেষ
প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার ২৭ নভেম্বর আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ফায়েকুজ্জামানকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিজস্ব অর্থ জমাদানকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মোট ক্ষতিগ্রস্ত হিসাবের সংখ্যা ১৭ লাখ ৮৪ হাজার। ১০ লাখ টাকার ঊধর্ে্বর হিসাবে আলোচ্য সময়ে সুদ হয়েছে ২ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হিসাবে সুদের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা। মার্জিন ঋণ নেয়নি এমন হিসাবের সংখ্যা ১১ লাখ ১৫ হাজার। তাদের ক্ষতির পরিমাণ ১২ হাজার ২৭৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অপরদিকে মার্জিন হিসাবের সংখ্যা ৬ লাখ ৬৯ হাজার। তাদের ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার ৭০ কোটি ৬১ লাখ টাকা।
কমিটির সুপারিশ
পুঁজিবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিযোগকারীদের জন্য বিশেষ স্কিম প্রণয়ন কমিটি কিছু আর্থিক প্রণোদনার সুপারিশ করেছে। কমিটি বলেছে, মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউসসহ সংশ্লিষ্ট ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হিসাবগুলোতে কেস-টু-কেস মেরিট ভিত্তিতে ১ বছর সময়ে অর্জিত (২০১১ পঞ্জিকা বছর অথবা ২০১১-১২ অর্থবছর) সুদের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ মওকুফ করতে পারবে। তবে মওকুফের পরিমাণ কোনো অবস্থায়ই মূলধনী ক্ষতি থেকে বেশি হবে না। মওকুফ অবশিষ্ট সুদ যদি থাকে তা একটি সুদবিহীন ব্লক হিসেবে স্থানান্তর করে তিন বছরে ত্রৈমাসিক সমান কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। কমিটি বলেছে, মার্জিন হিসাবে ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর ডেবিট ব্যালেন্স থেকে মোট মওকুফযোগ্য সুদ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ ভিন্ন হিসাবে স্থানান্তর করে যুক্তিসঙ্গত হারে সুদ (সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হারে) তিন বছরে সমান ত্রৈমাসিক কিস্তিতে পরিশোধের জন্য পুনঃতফসিল করা হোক। প্রস্তাবিত সুদ মওকুফ/পুনঃতফসিল সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান দাতা-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে কেস-টু-কেস বিবেচনার ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া কমিটি ভিন্ন হিসাবে স্থানান্তরিত ঋণের অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান/ব্যাংকের একক ঋণসীমা এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুরোধ জানানোর সুপারিশ করেছে।
কমিটি নতুন করে মার্জিন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানান্তরিত হিসাবের অর্থ বিবেচনায় না নিয়ে প্রচলিত নিয়মে ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে নতুনভাবে মার্জিন ঋণ দিয়ে সিকিউরিটিজ ক্রয়-বিক্রয়ের সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে সহায়তা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হিসাবের যথার্থতা নিরূপণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং ব্রোকারেজ হাউসের নিরীক্ষক/পরিচালনা পর্ষদ নির্ধারিত ছকে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

