পদ্মা সেতুঃ বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হচ্ছে
১৫ ফেব্রুয়ারি: পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থায়ন বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে করা ঋণ চুক্তি বাতিল হচ্ছে। বিশ্বব্যাংককে বাদ দিয়েই বিকল্প উৎস থেকে অর্থ নিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সরকার। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তি বাতিলের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
পদ্মা সেতুর অর্থায়ন সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকসহ অন্য দাতাদের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি বাতিলের জন্য সেতু বিভাগ থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কাছে চিঠি যাচ্ছে। দু'একদিনের মধ্যেই এ চিঠি পাঠানো হবে। চিঠি পাওয়ার পর ইআরডি সরকারের নীতিগত এ সিদ্ধান্ত দাতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেবে। এর পরই বিকল্প অর্থের উৎস নিশ্চিত করবে সরকার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের জন্য আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নকারী সংস্থা হচ্ছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেতু বিভাগ। তারা চিঠি লেখার পর সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা দাতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ সংক্রান্ত চিঠির খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। দু'একদিনের মধ্যে সরকারের অবস্থানের কথা জানিয়ে দেওয়া হবে। সেতু বিভাগের সচিব খোন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, একটু অপেক্ষা করুন, খুব শিগগির এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা হবে।
এদিকে গতকাল সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ঋণ কার্যকারিতার জন্য বিশ্বব্যাংক যে সময় দিয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের আর সময় দেওয়া যায় না। বিকল্প উৎস থেকে পদ্মা সেতুর অর্থের জোগান দেওয়া হবে। পিপিপির মাধ্যমে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত হলে আগে দাতাদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করতে হবে।
জানা গেছে, বিকল্প উৎস হিসেবে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রস্তাব সক্রিয় বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রক্রিয়াগত বিলম্বের কারণে আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সম্ভাবনা কম। মালয়েশিয়ার প্রস্তাবে বিওওটি পদ্ধতিতে টোল আদায় করে ৩৫ থেকে ৪০ বছরে বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মালয়েশিয়া সরকারের বিশেষ দূত দাতো সেরি এস স্যামি ভেলু পদ্মা সেতু নির্মাণে তার দেশের আগ্রহের কথা ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানান। যোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। এর পর সমঝোতা স্মারক সই করার জন্য গত ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেন তিনি। ২৩০ কোটি ডলার ব্যয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার জন্য গত বছরের এপ্রিলে সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি এডিবি ৬১ কোটি, জাইকা ৪০ কোটি এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ১৪ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার জন্য একই বছর আলাদা চুক্তি করে। পরে দুর্নীতির অভিযোগ এনে অর্থায়ন স্থগিত করে দেয় বিশ্বব্যাংক। ইআরডির এক সূত্র জানায়, যৌথ অর্থায়নের কারণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হলে স্বাভাবিক নিয়মে অন্য দাতাদের সঙ্গেও বাতিল হয়ে যাবে। তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করার পরই বিকল্প দেশের সঙ্গে অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা শুরু করবে সরকার।
বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন বলেছে, পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য প্রাক্যোগ্যতা নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। দুদকের তদন্তে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী বর্তমানে তথ্য ও প্রযুক্তিমন্ত্রী আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। অর্থায়ন বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ অবস্থান হচ্ছে কানাডিয়ান সরকারের তদন্ত প্রতিবেদন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত অর্থছাড় বিষয়ে তারা বাংলাদেশ সরকারকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেবে না।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য : অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন নিয়ে সরকার এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এর পাশাপশি পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে। আগামী মৌসুমে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বিষয়টি আর দীর্ঘায়িত করার কোনো সুযোগ নেই।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সৌদি-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড এগ্রিকালচার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের (সাবিনকো) চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ এম আল তার্কির নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করে। এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।
পদ্মা সেতু নির্মাণে মালয়েশিয়ার আগ্রহ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেতু নির্মাণে মালয়েশিয়া আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সেটি পিপিপির অধীনে। পদ্মা সেতু নির্মাণ দাতাদের অর্থায়নে হবে নাকি পিপিপির অধীনে হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে পিপিপিতে যেতে হলে তার আগে যাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে তা প্রত্যাহার অথবা বাতিল করতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক ঋণের কার্যকারিতার মেয়াদ ছয় মাস বাড়িয়েছে। তাদের এ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি নিয়ে সরকার আর অপেক্ষা করতে রাজি নয়। বিষয়টি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কথা বলা হবে। তিনি বলেন, এখন আমাদের কতগুলো কাজ করতে হবে। পদ্মা সেতুতে নতুন উপায়ে অর্থায়ন করা হলে বিশ্বব্যাংকসহ চারটি সংস্থাকে বলা হবে_ তোমরা কীভাবে কী করতে পার। দুটি উপায় আছে_ একটি সরাসরি ঋণ, অন্যটি পিপিপি। তবে পিপিপি খুব ব্যয়বহুল। এটি যেহেতু বড় প্রকল্প, আমরা চাইব আরও বিনিয়োগকারীকে নিয়ে সরাসরি করা যায় কি-না।

