হোমপেজ অর্থনীতি আমদানি কমছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের

আমদানি কমছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের

 
 

৪ ফেব্রুয়ারি: নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে বলে আমদানিকারকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কারণ ব্যাংকে ডলার সংকট। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে এলসি খোলা হয়েছে চাহিদার অর্ধেক। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোগ্যপণ্য আমদানিতে জটিলতা কারণে নিত্যপণ্যের বাজার নতুন করে অস্থির হতে পারে। সমস্যার দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সোনালী ব্যাংক। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারেই সোনালী ব্যাংকের শাখা রয়েছে ১০৬টি। বৃহত্তর চট্টগ্রামে এতগুলো শাখা থাকলেও সোনালী ব্যাংকে ২০১১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ভোগ্যপণ্যের কোনো এলসি খোলা হয়নি। কেবল অক্টোবরে দুই হাজার ৮০০ টন ক্রুড এডিবল অয়েলের এলসি খোলার তথ্য আছে এ ব্যাংকে! শুধু সোনালী ব্যাংক নয়, এলসি খোলা চট্টগ্রামের অপর ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকেরও সাম্প্রতিক চিত্র এমন। বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের এলসি চিত্র সংগ্রহ করে দেখা যায়, ভোগ্যপণ্যের এলসি কমছে। চাল, চিনি, ভোজ্যতেল, গমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দুই-তৃতীয়াংশ আমদানিকারক চট্টগ্রামে থাকলেও এলসি খোলার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।

চট্টগ্রামের ৪৫টি ব্যাংকে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে চিনির কোনো এলসিই খোলেননি ব্যবসায়ীরা! অক্টোবর মাসে ৫০ হাজার ৪০০ ডলার দিয়ে ৭২ টন চিনি আমদানির মাত্র একটি এলসি আছে চট্টগ্রামে। একইভাবে ২০১১ সালের শেষ তিন মাসে চট্টগ্রামে ভোজ্যতেলের এলসি খোলা হয়েছে মাত্র এক লাখ ৪০ হাজার টনের। গমের এলসি খোলা হয়েছে মাত্র আড়াই লাখ টনের। অথচ চিনি, ভোজ্যতেল, গম, ডালসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের শীর্ষ আমদানিকারকদের মধ্যে চট্টগ্রামে রয়েছে এস আলম গ্রুপ, নূরজাহান গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, এসএ গ্রুপ, এমইবি গ্রুপ, বিএসএম গ্রুপ, এ জামান অ্যান্ড ব্রাদার্সসহ অন্তত এক ডজন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান। এখানে রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম পাইকারি মোকাম খাতুনগঞ্জও।

শুধু চট্টগ্রাম নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের এলসি চিত্রে হতশ্রী অবস্থা সারাদেশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বিত এলসি চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১০ সালের শেষ ছয় মাসের তুলনায় ২০১১ সালের একই সময়ে কেবল চিনি ও ডাল জাতীয় শস্য বেশি এসেছে দেশে। বেশিরভাগ ভোগ্যপণ্য আমদানিতে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা এভাবে নিষ্ক্রিয় থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ সর্বনিম্নে পেঁৗছার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ গত তিন মাসে এলসি খোলা পণ্যই আগামী তিন মাসে দেশে আসবে পর্যায়ক্রমে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলার সংকটের অজুহাতে এলসি খুলতে তাদের নিরুৎসাহিত করছে ব্যাংক। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের এখনও ভোগ্যপণ্যের শতাধিক এলসি প্রস্তাবনা আটকে আছে। ভোজ্যতেল ও গম আমদানি করা চট্টগ্রামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তিন মাস ধরে বিভিন্ন ব্যাংকে ৪০ হাজার টন ভোজ্যতেল আনার ৮টি এলসি আটকে আছে। এদিকে আমদানিনির্ভর নিত্যপণ্যের মজুদ ধীরে ধীরে কমতে থাকায় বাড়তে শুরু করেছে দাম। এরই মধ্যে ভোজ্যতেলের দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা।


সারাদেশের চিত্র

শীর্ষ ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ চট্টগ্রামে থাকলেও এলসি খোলার পরিমাণ এখানে দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা চিনি আমদানির জন্য ডিসেম্বর মাসে কোনো এলসি না খুললেও ঢাকাসহ অন্যান্য এলাকার ব্যবসায়ীরা এক দশমিক ১৮ লাখ টন চিনি আমদানির এলসি খুলেছেন। আবার জুলাই থেকে নভেম্বরে সারাদেশের আমদানি চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১১ সালের এ সময়ে ৯ দশমিক ০৫ লাখ টন চিনি এসেছে। অথচ ২০১০ সালের একই সময়ে চিনি এসেছিল ৭ দশমিক ৮৪ টন। ব্যতিক্রম চিত্র আছে ডাল জাতীয় শস্যেও। ২০১১ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরে এ জাতীয় ২ দশমিক ০৬ লাখ টন পণ্য এলেও গত বছরের একই সময়ে দেশে এসেছিল মাত্র ১ দশমিক ৮৩ লাখ টন ডাল।

চাল, গম, ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্য আমদানির এলসি এবারে কম হয়েছে সারাদেশেই। ২০১১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসে সারাদেশে ২ দশমিক ১৬ লাখ টন চাল এলেও ২০১০ সালের একই সময়ে এসেছিল ৯ দশমিক ১০ লাখ টন। এবারে ৯ দশমিক ৮০ লাখ টন গম এলেও গত বছর একই সময় এসেছিল ২২ লাখ টন। আবার ২০১১ সালের শেষ ছয় মাসে ক্রুড এডিবয়েল এসেছে ৬ দশমিক ১৪ লাখ টন। ২০১০ সালের একই সময়ে ক্রুড এডিবয়েল এসেছে ৭ দশমিক ৩৬ লাখ টন।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যা বলছে

চট্টগ্রামে ভোগ্যপণ্য আমদানির এলসি ব্যাপক হারে কমে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক কেএম মোস্তাফিজুল কবির। তবে সোনালী ব্যাংক চট্টগ্রাম অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক দিদার মোঃ আবদুর রব এলসির পরিমাণ আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে বলে স্বীকার করেন। চট্টগ্রামের আইএফআইসি ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার ম্যানেজার মাইনুল কবিরও এলসি খুলতে সাবধানতা অবলম্বন করার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, 'আগে দুই লাখ ডলার পর্যন্ত এলসি খুলতে পারতাম আমরা নিজেরাই। ডিসেম্বর থেকে সব ধরনের এলসির প্রস্তাব সকেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখান থেকে অনুমোদন হওয়ার পরই এলসি নিষ্পত্তি করতে হচ্ছে আমাদের। এ প্রক্রিয়ার কারণে এলসি প্রস্তাব নিষ্পত্তি করতে এখন আগের চেয়ে একটু বেশি সময় লাগছে।'

 

By A Web Design