হোমপেজ রাজশাহী রাজশাহীর প্রথম শহীদ - নুরুল ইসলাম

রাজশাহীর প্রথম শহীদ - নুরুল ইসলাম

 
 

 রাজশাহীর প্রথম শহীদ তুমি নুরুল ইসলাম,

 এ সমাজের কিছু মানুষ নেয়না তোমার তোমার নাম।

 তুমি যদি শহীদ হতে কোলকাতার কোন লেনে,

 খুদিরাম হয়ে থাকতে তুমি সব মানুষের মনে।

 তুমি যদি শহীদ হতে লঙ্কা ভুটানে,

 মূর্তি বানিয়ে করত পূজা রাখতো তাদের উঠানে।

 তুমি যদি শহীদ হতে বরফে ঢাঁকা নেপালের কোন স্থানে,

 প্রতিবাদ করত মানুষ যে কথা লিখেছে শিরোইল স্কুলের ম্যাগাজিনে।

 তুমি যদি শহীদ হতে ৫২ ভাষা আন্দোলনে,

 তোমার স্মৃতি খুঁজে পেতাম শহীদ মিনারের কোন কোণে।

 কেউ বলুক আর না বলুক তুমি প্রথম শহীদ নুরুল ইসলাম,

 তুমি মহান করুণাময়ের শহীদি খাতায় লিপিবদ্ধ একটি নাম।

 সত্যই যদি হয় সভ্যতার মাপকাঠি,

 তুমি প্রথম শহীদ পড়ে আছো জ্বলে শেষ হওয়া এক ধুপকাঠি

 সত্যই যদি হয় সভ্যতার মানদন্ড,

 তবে রাজশাহীতে নেই কেন তোমার কোন স্মৃতি স্তম্ভ।

 যে কারণে তুমি জীবন করেছিল বলিদান,

 ২২ ফেব্রুয়ারী শেখ মুজিব কারামুক্তি পান।

 বঙ্গবন্ধু উপাধি পেয়ে এসেছিলেন রাজশাহীতে,

 ফাতেহা পাঠে তোমার সমাধিতে কামারুজ্জামান ছিলেন সাথে।

 সত্যই যদি হয় সভ্যতার চালিকা রথ,

 কোথায় তুমি হারিয়ে গেলে খুঁজে পায়না পথ।

 তোমার পিতা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রেমী অফিসার,

 ৭১-এ রাজাকাররা তাঁকে হত্যা করেছে ভেঁসে গেছে সংসার।

 এখন যারা বেঁচে আছে সইছে লাঞ্ছনা আর অপমান,

 এদেশে এটাই সত্য শহীদ পরিবার কখনও পায়না সম্মান।


৭৯ এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অবদান রাখা শহীদ নূরম্নল ইসলামের ভগ্নিপতি এস এ আকবরের কবিতার চারণ থেকে অংশগুলি অন্তরের গভীরতা থেকে উপলব্ধি করলে পরিষ্কার হয়ে যাবে সবকিছু। কিন্তু প্রশ্ন কেন ৪০ বছর হয়ে গেলেও নেই সেই অবদানের, কিসের বাধা? অথচ সেই অবদানের সিড়ি বেয়েই এসেছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিজয়। এগিয়ে গেছে মুক্তি সংগ্রামের প্রস্তুতি।

আহত ছাত্রদের সেবা করতে পেরে আমি ধন্য। ছাত্রের দু
ফোঁটা রক্তের স্পর্শে আমি পবিত্র। এরপর শুধু ছাত্ররা নয় আমরা সবাই মিলে দানবীর শক্তিকে রুখে দাঁড়াবো। মরতে যদি হয় আমরা সবাই মরবো।এটি উনসত্তরের আইয়ূবশাহী বিরোধী গণ-অদ্ভ্যুত্থানের একটি প্রতিবাদী এই কোন সংগ্রামী ছাত্র,শ্রমিক-জনতা বা রাজনৈতিক ব্যক্তির নয়। এ ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রিয় শিক্ষক ড. শামশুজ্জোহার শপথের কথা। বুকের গভীর থেকে উচ্চারিত তার এই শপথের বাণীই সেদিন ছাত্র জনতার মিছিলের মর্মবাণীতে পরিণত হয়েছিল। কেঁপে উঠেছিল গণ-বিরোধী,আইয়ূব খানের  শাসন। আইয়ূব খানের পতন অনিবার্য হয়ে উঠে। ফিরে এলো রক্তে স্নাত স্মৃতি চারণের সেই ৭৯ এর উত্তার ১৮ ফেব্রুয়ারী। এই দিন পাকিস্তানী সৈন্যদের নির্মম বেয়নেট চার্জে শহীদ হন তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা।    পাকিস্তান সৈন্যদের গুলিতে শহীদ হন নুরুল ইসলাম। গুলিবিদ্ধ হয়ে ও চরম নির্যাতনে মারাত্মক আহত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মারা যায় স্কুল ছাত্র আব্দুস সাত্তার।

উনসত্তরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হকের হত্যা ও গণ নির্যাতনের প্রতিবাদে সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডাকা হয়েছিলো সাধারণ ধর্মঘট। সেদিন রাজশাহীর মহানগরীতে ছাত্র মিছিলের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ
,কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপে আহত হয় ১৬ জন ছাত্র। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঘটনাস্থলে আসেন ড. শামশুজ্জোহা। আহত ছাত্রদের বুকে টেনে নেন। প্রতিবাদ করেন নির্যাতনের বিরুদ্ধে। অনেক কথা কাটাকাটির পর নিজের গাড়িতে আহত ছাত্রদের নিয়ে যান রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আহত ছাত্রদের আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন,ভয় নেই,আমরা আছি তোমাদের পাশে।রাত দশটায় বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারে শিক্ষক-ছাত্রদের প্রতিবাদ সভায় উচ্চারিত করেছিলেন তাঁর শপথের কথা।

পরেরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি জারি করা হয়েছিলো ১৪৪ ধারা। নামানো হয়েছিলো পাকিস্তানী সৈন্য। টহল দিচ্ছিলো তাদের সাজোয়া গাড়ী। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার প্রস্তুতি নেয় ছাত্র জনতা। ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে মধ্য শহরের আন্দোলন তখন তুঙ্গে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে মধ্য শহরের দিকে আসার প্রস্তুতি নেয়। পাকিস্তানী সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাক করে অস্ত্র। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটের সামনে সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা নির্দেশ দেয়
কিল্ড দেম,ফায়ার। ডক্টর শামশুজ্জোহা ছাত্রদের বাঁচাতে ছুটে আসেন,চীৎকার করে বললেন-প্লিজ ডোন্ট ফায়ার,আমার ছাত্ররা এখনই ভেতরে চলে যাবে।এরপরও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঐ কর্মকর্তাটি আবারো নির্দেশ দেয়,ফায়ার। শুরু হয় বেপরওয়া গুলীবর্ষণ। আহত হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী আবদুল মান্নান,ড. কছিমউদ্দীন মোল্লা,আব্দুল খালেকসহ অনেককে। নির্মমভাবে বেয়েনেট চার্জ করা হয় ড. শামশুজ্জোহাকে। এই ঘটনায় ভীষণভাবে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত ছাত্ররা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার খবর আসার সাথে সাথে মধ্য শহর হয়ে উঠেছিলো তুমুল উত্তেজিত। একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ১১ দফা আন্দোলনের নেতা রাজশাহী সিটি কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা নুরুল ইসলাম। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন পুরাতন ভবন (তৎকালীন পৌরসভা) এর ছাদ থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী নূরুল ইসলামকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে সোনাদিঘী মসজিদের সামনে শহীদ হন তিনি। রাস্তায় ছেচড়িয়ে পা ধরে টেনে পাকিস্তানী সৈন্যরা তাঁকে পৌরসভা ভবনে নিয়ে গিয়ে গাড়ির তলায় ফেলে রাখে। আরেকটি মিছিলে বন্ধু মোসলেম সহ অন্যদের সাথে ছিলো রাজশাহী হাই মাদ্রাসা স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র আব্দুস ছাত্তার। তাকে সেদিন বাড়িতে আটকিয়ে রাখা যায়নি আটকিয়ে। মিছিলে আসা বড় ভাই আব্দুল আজিজকে খুঁজতে এসে সেও যোগ দেয় মিছিলে। গুলি বিদ্ধ হয় রাজশাহী কলেজ মহিলা হোস্টেলের পূর্ব পাশে তেঁতুল তলায়। তাকেও রাস্তায় ছেচড়িয়ে,পা ধরে টেনে পাকিস্তানী সৈন্যরা পৌরসভা ভবনে এনে লাঠি,পায়ের বুট জুতো দিয়ে করতে থাকে নির্যাতন। এক গাড়ী চালক তাকে চিনে বলে কৌশলে তাদের কাছ থেকে সরিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। ড. শামশুজ্জোহাকে মারাত্মক আহত অবস্থায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পৌরসভা ভবনে এনে ফেলে রাখে। দেরি করে তাঁকে পাঠানো হয় হাসপাতালে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে এই সাহসী শিক্ষক বলেছিলেন,সময়মত চিকিৎসা হলে আমি বেঁচে যেতাম। লাশ নিতে শহীদ নূরুল ইসলামের বাবার উপর শর্ত চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। কেঁপে ওঠে সারাদেশ। ক্ষমতা ছেড়ে দেন পাকিস্তানের লৌহ মানব ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব খাঁন। শহীদ নূরুল ইসলাম ছিলেন সাহসী ছাত্র নেতা। সংগঠনের সম্মেলনে গিয়েছিলেন ঢাকায়। ঢাকা তখন ১১ দফা আন্দোলনে উত্তাল। একটি মিছিলের ওপর গুলি চালালে নবরূপ স্কুলের ছাত্র মতিউর শহীদ হয়। মতিউরের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিলো নূরুল ইসলামের পোশাক। মতিউরের লাশ নিয়ে শ্লোগান তুলে সেদিন নূরুল ইসলাম কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন রাজধানী ঢাকা। রাজশাহী ফিরে ১১ দফা আন্দোলনকে তীব্র করতে থাকেন। ১৮ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। ছয় মাস চিকিৎসা থাকা অবস্থায় হাসপাতালে মারা যায় স্কুল ছাত্র আব্দুস সাত্তার। তার শরীরে ধরেছিল পচন।

 

এখানেই শেষ নয়। শহীদ নূরুল ইসলামের পিতা এই অপরাধে রেলওয়েতে কর্মরত তাঁর পিতা আব্দুল কুদ্দুস কে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা করে কিছু অবাঙালী। সূত্রে জানা যায় বিরোধী কিছু বাঙালী তাকে ধরিয়ে দেয় অবাঙালীদের কাছে তিনি আর ফিরে আসেনি। পরিবারে দেখা দেয় সংকট। সবকিছু মেনে নিয়ে পরিবারের সকলে অপেক্ষা করতে থাকেন মুক্তিযুদ্ধের পর শেখ মুজিবর রহমান যতদিন বেঁচে ছিলেন,পরিবারটির খোঁজ-খবর রাখতেন। দূর্ভাগ্য তিনি নিহত হওয়ার পর যাদের উচিত ছিল পরিবারটির খোঁজ-খবর রাখার,তারা তা করেননি। আর্থিক অনটনে,রোগে-শোকে মারা যান তার মা। আত্মহত্যা করেন তার দুই ভাই। শহীদ নুরুল ইসলাম-শহীদ সাত্তারদের কথা কেউ মনে রাখে না এটিই বললেন দুই পরিবারের সদস্যরা। কষ্ট হয় শহীদ নুরুল ইসলাম শহীদ সত্তারদের অবদানের নেই ইতিহাসের পাতায়। সবাই ভুলতে বসেছে তাদের কথা। অথচ তারা সেদিন গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য রক্ত দিয়েছিলেন। আওয়ামীলীগ নেতা এইচ.এম.কামারুজ্জামান শহীদ আব্দুস সাত্তারের পরিবারের খোঁজ-খবর নিতেন। এরপর কেউ তাদের খোঁজ নেননি। এই পরিবারটিও তাদের স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন শহীদ সাত্তারকে। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন শহীদ আব্দুস সাত্তার স্মরণে পাঠানপাড়া এলাকায় একটি রাস্তার নাম করণ করে,তবে কারা যেন নামফলকটি ভেঙ্গে ফেলে অনেক আগেই।      এ অভিযোগ পাওয়া যায় বার বার। ১৮ ফেব্রুয়ারী শিক্ষক-ছাত্র দিবস ঘোষণার দাবি অনেক আগের। আজকের প্রজন্মদের জানতে দেওয়া হয়না শহীদ ড. শামশুজ্জোহা,শহীদ নূরুল ইসলাম,শহীদ আব্দুস সাত্তারদের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে শহীদ ড. শামশুজ্জোহা হল। ১৮ ফেব্রুয়ারী পালিত হয় নানা কর্মসূচী। রাজশাহী সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ শহীদ নূরুল ইসলাম রাজশাহী হাই মাদ্রাসা স্কুল কর্তৃপক্ষ শহীদ আব্দুস সাত্তার স্মরণে উদ্যোগ নিতে পারেন কিন্তু তাদের সে ধরণের কোন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি কখনো। শহীদ নুরুল ইসলাম,শহীদ সাত্তারের অবদানকে দিতে সিটি কর্পোরেশন,সিটি কলেজ,রাজশাহী হাই মাদ্রাসা বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে।এ উদ্যোগ নিতে বাঁধা কোথায়?কিসের অনীহা।

শহীদ নুরুল ইসলাম,শহীদ সাত্তারের অবদান স্মরণীয় করে রাখতে কেউ কি উদ্যোগ নিতে পারেন না? চাই শহীদ নুরুল ইসলাম-শহীদ সাত্তারের অবদানের ১৮ ফেব্রুয়ারী স্মরণীয় হয়ে থাকুক রাজশাহী তথা সকল দেশবাসীর হৃদয়ে। - ওয়ালিউর রহমান বাবু, কলাম লেখক,সমাজকর্মী,রাজশাহী।

 

 

 

By A Web Design